জীবনের প্রথম পরীক্ষা!
স্কুলে ভর্তি হবার ক’মাস পরেই স্কুলে পরীক্ষা শুরু হল। জীবনে প্রথম পরীক্ষা, তাই খুব ভাবে ছিলাম। বড়দের মত আমিও পরীক্ষা দেব, নিজেকে কিছুটা বড় বড় বলে মনে হতে লাগল। ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম যে, বড়রা যা করে আমিও তাই করতে যাচ্ছি। আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করছে। কলম পেন্সিল গুছিয়ে মা’কে বললাম, মা যাই। মা বললেন, তোর দাদাভাইকে সালাম দিয়ে যা। সালাম দিতে হবে কেন! মনে মনে কিছুটা জটিলতা অনুভব করলাম, এখানে সালাম দেয়ার কি আছে। কিন্তু দাদাভাইকে সালাম দেয়ার পর পুরো ভড়কে গেলাম। দাদাভাই দু’হাত তুলে খোদা তায়ালার কাছে কান্না-কাটি করছেন, আমার পরীক্ষা যেন ভাল হয়। দাদাভাই’র কান্না-কাটি দেখে বুঝলাম, পরীক্ষা কোন সাধারণ ব্যাপার নয়। টের পেতে থাকলাম, কিছুক্ষণ পর স্কুলে যেটা ঘটতে যাচ্ছে সেটা জীবনের এক বড় বিষয়। গলা কিছুটা শুকিয়ে আসছে। দাদার দোয়ায় যদি কাজ না হয়, তো পরিনতি কি হবে! নিশ্চয়ই খারাপ কিছু হবে, তা না হলে দাদা কাঁদলেন কেন! অজানা আশংকায় মন টা দূরু দূরু করতে লাগল। অন্যমনষ্ক হয়ে পড়লাম। প্রমাদ গুনলাম, হায় খোদা, কিভাবে এ কঠিন সময় পার করব ? পরীক্ষা না দিলে কি এমন হয়। দুনিয়ার সকল লেখাপড়া যদি পরীক্ষা ছাড়া হত, কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত। পথে যেতে যেতে জাবির এর বড়ভাই সম্রাট শাহজাহান ধমক দিলেন, আস্তে হাঁটছি কেন।দেরী হলে ভট্রাস বাবুর বেত একটাও মাটিতে পড়বে না। ভট্রাস বাবু কি জিনিষ তা আমি কিছুটা হলেও টের পেয়েছি। মনে হচ্ছে পরীক্ষার দেরী হয়ে যাচ্ছে। বিপদ ঘনিয়ে আসছে বলে মনে হল। শুদ্ধ করে দোয়া-কালাম পড়তে লাগলাম। কোন দোয়াই শুদ্ধ করে পড়া হয়না। তবুও বলতে লাগলাম- খোদা পরীক্ষা যখন ঠেকানো যাচ্ছে না, তুমি আমার জীবনের সকল পরীক্ষার সময় অসুখ বাধিয়ে দিও। যাতে পরীক্ষা দিতে না হয়। সম্ভব হলে এখনি যেন একটা অসুখ দিয়ে দেন, তাহলে বাড়ি গিয়ে ফকিরকে একটা টাকা দিব।
কখন যে পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে, টেরই পাইনি। কোন অভিজ্ঞতা না থাকায় কিভাবে শুরু করতে হবে, বুঝতে পারছিনা। ঘন্টা পড়ার শব্দ শুনলাম, বলা হল বেশী সময় নেই। কান্নাকাটি শুরু করে দিলাম। সিনিয়র সম্রাট শাহজাহান ভাই আমার প্রতি সদয় হলেন। কিভাবে কি করতে হয় যতই বুঝান, কাজ না হওয়ায় তিনি নিজেই আমাকে লিখে দিতে শুরু করলেন। এই মহান ব্যক্তিটিকে আমার ত্রাণ কর্তা বলে মনে হল। পরম মমতায় মহামতি সম্রাট শাহজাহান লিখে যাচ্ছেন, চরম কৃতজ্ঞতায় আমি আহ্লাদে গদ গদ হয়ে দেখে যাচ্ছি। বিগলিত হচ্ছি, আর ভাবছি, আচ্ছা শাহজাহান ভাই এমন শুকিয়ে যাচ্ছেন কেন, আজকেই বাড়ি গিয়ে মা’কে বলে উনাকে পিঠা খাওয়াব। কিন্তু নিয়তি বড়ই নিষ্ঠুর। পিঠা যে কখন পিটা হয়ে উনার পিঠে পড়বে কে জানতো।
জাবির তার ভাইকে সতর্ক করল, ভট্রাস আসছেন।
এসেই ভট্রাস স্যার রুদ্রমূর্তি ধারন করলেন। আধা তোতলা ভট্রাস স্যার রেগে গেলে ধূতির কোঁচা ডলতে থাকেন,আর নাক কুঞ্চিত করে চোখ দু’টি নাচাতে থাকেন। এসব দেখার পরম সময় হাতে নেই। এসেই ধড়াস করে সম্রাটের পিঠে দিলেন কষে একটা বেত। ঘটনার আকষ্মিকতায় মহামতি সম্রাট চাকতির মত গোল হয়ে সব মার হজম করতে লাগলেন। আর স্যার! স্যার! স্যার! আমি না ঐ!ঐ!ঐ!করে যতই আমার দিকে নিরীহ আঙ্গুল তুলছেন, ততই আমি স্কুলের ভাঙ্গা বেড়ার দিকে ধাবিত হচ্ছি। ভয়ংকর ভট্রাস মহোদয় বেত নিয়ে এগুতেই দেই লাফ! বেড়ার ওপাশে ময়লা ডোবায় পড়েই দে ছুট। পরীক্ষার গুষ্টি কিলাই। দুইটা ষন্ডা মার্কা ছাত্রকে ভট্রাস হুকুম করলেন, ধরে আন।
একটা বিপদ না কাটতেই আরেক বিপদ। গভীর শুপারির বাগান ভেদ করে বাড়ি যাব কি করে। শেয়ালের ভয়। আজ কোন দোয়াই কাজে আসে নি।শাহজাহান ভাই এর কথা মনে পড়ল। আমার প্রতি তাঁর কি প্রতিক্রিয়া হয় অনুমান করতে পারছি না। মাকে কি বলব এসব টেনশনে এ সব চিন্তায় স্কুলে কখন যে পরীক্ষা শেষ হয়েছে বুঝতে পারিনি।
মা বলেছেন, বিপদে ভয় পেতে নেই, অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে। তবে কতদূর যেতে পারবো জানিনা, যেই বাগানের পথে ঢুকছি, ওমনি আমার মহান সম্রাট শাহজাহান আস্ত একটা মোটা লাঠি নিয়ে রন হুংকার দিলেন আয়......... !
রীতিমত দোয়া ইউনুস পড়া শুরু করলাম। ........
যা হোক... ভাগ্গিস দাদাভাই এগিয়ে নিতে এসেছিলেন, তাই রক্ষে।
ভাল লাগল আপনার পরীক্ষার গল্প
উত্তরমুছুন